তাপই সেই প্রতিবন্ধকতা যা আমাদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারে এমন ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরি করা থেকে বিরত রেখেছে। উচ্চ তাপমাত্রায় ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো শুধু যে তাপীয়ভাবে সীমিত হতে শুরু করে তাই নয়, বরং সেগুলোকে ২০০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় নিয়ে গেলে সেগুলো পুরোপুরি কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু সেই ধারণা বদলে যেতে পারে, কারণ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল সম্ভবত তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। 'সায়েন্স' জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় , গবেষকরা এমন একটি নতুন মেমরি চিপ তৈরি করেছেন যা ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে চলে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই তাপমাত্রা গলিত লাভার চেয়েও বেশি।
যন্ত্রটি হাল ছাড়ার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছিল না। সাতশ ডিগ্রি ছিল তাদের পরীক্ষামূলক যন্ত্রপাতির সর্বোচ্চ সীমা। এই প্রকল্পের প্রধান গবেষক জোশুয়া ইয়াং বলেন, “আপনি একে একটি বিপ্লব বলতে পারেন। এটি এখন পর্যন্ত প্রদর্শিত সেরা উচ্চ-তাপমাত্রার মেমরি।”
তারা এটা কীভাবে করলো?
চিপটি একটি ছোট স্যান্ডউইচের মতো করে তৈরি। উপরে টাংস্টেন, মাঝখানে একটি পাতলা সিরামিক স্তর এবং নীচে গ্রাফিন। এই উপাদানগুলোর প্রতিটিই নিজে থেকে প্রচণ্ড তাপ ভালোভাবে সামলাতে পারে, কিন্তু আসল জাদুটা ঘটে গ্রাফিন স্তরে।
একটি সাধারণ চিপে, তাপ ধাতব পরমাণুগুলোকে সিরামিক স্তরের মধ্য দিয়ে ঠেলে দেয় যতক্ষণ না উভয় দিক সংযুক্ত হয়, যার ফলে শর্ট সার্কিট ঘটে। গ্রাফিন এই ঘটনা ঘটতে বাধা দেয়। ইয়াং-এর মতে, গ্রাফিন এবং টাংস্টেন তেল ও জলের মতো কাজ করে। এর দিকে ভেসে আসা টাংস্টেন পরমাণুগুলো পৃষ্ঠতলকে আঁকড়ে ধরতে পারে না এবং পিছিয়ে আসে। যেহেতু কোনো নোঙর নেই, তাই চিপটি শর্ট-সার্কিট হয় না।
সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো, দলটি সম্পূর্ণ দুর্ঘটনাক্রমে এটি আবিষ্কার করে। ইয়াং বলেন, “সত্যি বলতে, এটা দুর্ঘটনাবশতই হয়েছিল, যেমনটা বেশিরভাগ আবিষ্কারই হয়ে থাকে।”
তাপীয় সীমা অতিক্রম করা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
তাপীয় সর্বোচ্চ সীমা নিশ্চিত করেছে যে আমরা এমন যন্ত্র তৈরি করতে পারি না যা চরম তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। এর মানে হলো, আমরা অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার গ্রহগুলিতে প্রোব পাঠাতে বা পৃথিবীর গভীরে খনন সংক্রান্ত কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারিনি। নতুন চিপটি আমাদের এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর সুযোগ করে দেবে।
এই চিপের আরেকটি ব্যবহার হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (AI) । ChatGPT-এর মতো AI সিস্টেমের ৯০ শতাংশেরও বেশি কম্পিউটিং একটি নির্দিষ্ট ধরনের গাণিতিক গণনার ওপর নির্ভরশীল। এই চিপটি এর মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার সাথে সাথেই সেই গণনাগুলো করতে পারে, যা এটিকে বর্তমানে ব্যবহৃত যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত এবং শক্তি-সাশ্রয়ী করে তোলে।
উল্লেখ্য যে, একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত পণ্য আসতে এখনও বেশ কয়েক বছর বাকি। কিন্তু ইয়াং-এর ভাষায়, “অনুপস্থিত উপাদানটি তৈরি হয়ে গেছে।” একবার এর উৎপাদন শুরু হলে, এটি চিপ প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ানো অন্যতম বড় একটি সমস্যার সমাধান করবে।
